বর্তমান সংসদের দিকে দেশের ৩৬ কোটি চোখ নিবদ্ধ: ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল

জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রতি দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাঁর ভাষায়, দেশের ১৮ কোটি মানুষের ‘৩৬ কোটি চোখ’ এখন সংসদের কার্যক্রমের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদ সদস্যরা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা এবং যুক্তিনির্ভর বিতর্কের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ভূমিকা রাখবেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
কায়সার কামাল বলেন, বর্তমান সংসদের কার্যক্রম এখন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রযুক্তির প্রসারের ফলে গ্রামাঞ্চলের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংসদের অধিবেশন অনুসরণ করছেন। তাই সংসদ সদস্যদের প্রতিটি বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব হলো সংসদ পরিচালনায় সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। দায়িত্ব পালনের পুরো সময়জুড়ে তিনি ন্যায়পরায়ণতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করবেন বলেও উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে একমত, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন বিশেষ দূতের বৈঠক
বর্তমান জাতীয় সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ হিসেবে উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, এই সংসদের অধিকাংশ সদস্য অতীতে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর দাবি, ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই কোনো না কোনো সময় কারাবরণ, গুম, নির্যাতন, নির্বাসন কিংবা অন্যান্য নিপীড়নের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছেন। এ কারণে তিনি বর্তমান সংসদকে বিশ্বের ইতিহাসেও ব্যতিক্রমধর্মী বলে অভিহিত করেন।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ও বিরোধী দলের সমানভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন কায়সার কামাল। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কায়সার কামাল আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার তিনটি প্রধান অঙ্গ—আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে জাতীয় সংসদই আইন প্রণয়নের কেন্দ্র। কার্যকর সংসদই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্তিশালী করে।
আরও পড়ুন: ভুলের মাশুল তারেক রহমানকে দিতেই হবে: গাড়িবহরে হামলার অভিযোগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, সংসদে সরকারি দল যেমন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পায়, তেমনি বিরোধী দলও গঠনমূলক সমালোচনার সুযোগ পায়। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা এবং যুক্তিনির্ভর বিতর্ক।
তিনি ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত ও পাকিস্তানের সংসদের উদাহরণ টেনে বলেন, উন্নত সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আলোচনা ও সমালোচনার মাধ্যমেই গ্রহণ করা হয়।
সংসদকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু করার আহ্বান:
কায়সার কামাল বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত জাতীয় সংসদ। তাঁর আশা, বর্তমান সংসদ দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাস নিয়ে মূল্যায়ন
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা ছিল। তবে স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নানা ঘটনার কারণে সেই প্রত্যাশা ব্যাহত হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটিতে দায়িত্ব পেলেন এমপি ফজলুর রহমান
তিনি ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ, পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন।
এছাড়া তিনি ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ২০০৮ সালের নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও নিজের মতামত ব্যক্ত করেন।
২০২৬ সালের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে এবং সেই নতুন অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হলো জাতীয় সংসদ।
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে কায়সার কামাল আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সংসদ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আরও পড়ুন: রাজশাহীর পবায় ৯ বছরের শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে জামায়াত নেতা গ্রেপ্তার
➡️ মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরের স্থান সংরক্ষণে উদ্যোগ নেবে সরকার: ইশরাক হোসেন
