সরকারের ছয় মাসে ৩১ সূচকের ১৯টিতে অবনতি, ১২টিতে অগ্রগতি

সরকারের ছয় মাসে ৩১ সূচকের ১৯টিতে অবনতি, ১২টিতে অগ্রগতি
ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপ

সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে দেখা গেছে, অর্থনীতির ৩১টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি ও মূল্যস্ফীতিসহ ১২টি সূচকে উন্নতি হয়েছে। বিপরীতে রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ঘাটতি ও মাথাপিছু ঋণের মতো ১৯টি সূচকে অবনতি বা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীতে সিপিডি আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে বড় শঙ্কা

সিপিডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন কঠিন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সিপিডির পূর্বাভাস অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে।

অন্যদিকে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। নিট বৈদেশিক সহায়তাও ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

৯৫ কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার মানুষ

শিল্প খাতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে।

সরকারের ৬ মাসে ৩১ সূচকের ১৯টিতে অবনতি: সিপিডি

এসব কারখানা বন্ধ হওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একই সময়ে শিল্প উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদনে চাপ

সিপিডি জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহের জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে।

শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসিএফ থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিএফে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি, তবে প্রকৃত মজুরি এখনো নেতিবাচক

মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে।

তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মূল্যস্ফীতি থেকে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

রপ্তানি বাড়লেও বেড়েছে আমদানি ও বাণিজ্য ঘাটতি

রপ্তানি খাতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে একই সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তও পরিণত হয়েছে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে।

অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

কমেছে বিদেশে কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি

রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে নেমেছে।

ফলে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক কিছু অগ্রগতি থাকলেও বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে বলে সিপিডির মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

সরকারের কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলেছে সিপিডি

সিপিডি সরকারের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাড়ানো।

এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়, কৃষিঋণের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং নারী চালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর মতো উদ্যোগকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা এবং শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার তাগিদ

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, রাজনৈতিক সাহসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ ও আইনের নজরদারির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার রাজনৈতিকীকরণের দিকে নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়। রাজনৈতিক পদায়নের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সরকার নিজেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর রাখা জরুরি বলেও মত দেন তিনি।

‘এ’ দিতে চাইলেও ‘বি’র দিকে যাচ্ছে

সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারকে ‘এ’ দিতে চাইলেও বাস্তবতা তাকে ‘বি’র দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারের কর্মকাণ্ডে অনেক ‘নয়েজ’ থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ‘মিউজিক’ পাওয়া যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সাহস দেখানো, দলের নেতাকর্মীদের সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং আমলাদের যথাযথ দায়িত্বে রাখাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচির সুপারিশ

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি। পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত, এনবিআর, রাজস্ব-ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন ও বেতন কমিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুত ও জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সিপিডি।

সব মিলিয়ে, এখন পর্যন্ত অর্জিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভঙ্গুর হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সময়বদ্ধ ও সমন্বিত সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে সিপিডি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *