ধানমন্ডি লেক সংস্কারে ৭৫ কোটি টাকার পরিকল্পনা

ধানমন্ডি লেক সংস্কারে ৭৫ কোটি টাকার পরিকল্পনা
ধানমন্ডি লেক | ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর ধানমন্ডি লেককে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ৭৫ কোটি টাকার সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, লেকের সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা এবং নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে। ‘বিদ্রোহী চত্বর’ নামেও পরিচিত হতে যাওয়া এ স্থাপনাটি নজরুলের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চেতনা তুলে ধরার একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই মূল সংস্কারকাজ শুরু হবে।

জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব

প্রায় ৮৬ একর আয়তনের ধানমন্ডি লেকের প্রায় ৫৫ একরজুড়ে রয়েছে জলাশয়। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, পুরোনো অবকাঠামো এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে লেকটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও ব্যবহারযোগ্যতা অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ডিএসসিসির পরিকল্পনায় লেকের পাড় সুরক্ষা, ঢাল স্থিতিশীল করা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা এবং হাঁটার পথ সংস্কারের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে আলোকসজ্জা, সীমানাবেষ্টনী ও নিরাপত্তা রেলিং উন্নত করার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।

লেককে আরও আকর্ষণীয় করতে তিনটি ভাসমান ডেক, কিয়স্ক, আধুনিক জিম, লাইব্রেরি, প্রদর্শনী গ্যালারি, ক্যাফেটেরিয়া, অ্যাম্ফিথিয়েটার, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, উন্মুক্ত ব্যায়ামের স্থান এবং পার্কিং সুবিধা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া গাছের পরিচর্যা ও চিকিৎসার জন্য ‘ট্রি হাসপাতাল’ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, আধুনিক সাইনেজ ও পথনির্দেশনা, সিসিটিভি এবং গণঘোষণা ব্যবস্থাও যুক্ত করার কথা রয়েছে।

২৫ কোটি টাকায় ‘নজরুল সরোবর’

প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘নজরুল সরোবর’ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ধানমন্ডির ১৩/এ ও ৮/এ সড়কের পাশে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের বিপরীতে প্রায় ৫০ দশমিক ৯৬৭ কাঠা জায়গায় এটি নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।

এখানে নজরুলসংগীত, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা আয়োজনের জন্য উন্মুক্ত অ্যাম্ফিথিয়েটার থাকবে। শিল্পীদের জন্য গ্রিনরুমের পাশাপাশি একটি রেস্তোরাঁ, জনসাধারণের জন্য শৌচাগার এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তথ্যফলক স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

তথ্যফলকে নজরুলের জীবন ও সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নজরুলের সাহিত্য ও বিদ্রোহী চেতনাকে কেন্দ্র করে বুক কর্নার, নগর বন এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য একটি প্রধান প্লাজা তৈরির কথা রয়েছে। লেকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ঘাট এবং পথচারীদের জন্য পৃথক হাঁটার পথও রাখা হবে।

ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের মতে, নজরুল সরোবরের মাধ্যমে কবির সাহিত্যকর্মের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন একটি পরিসর তৈরি করা সম্ভব হবে।

সংস্কারের আগে পরীক্ষামূলক কাজ

ডিএসসিসির অঞ্চল-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয় জানান, লেকের তলদেশ পরিষ্কারের আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তার তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলক কাজ শেষ হতে প্রায় ৭০ দিন সময় লাগতে পারে। এই কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর ধানমন্ডি লেক সংস্কার ও নজরুল সরোবর নির্মাণের কাজ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন সাংস্কৃতিক ভেন্যু নিয়ে প্রশ্ন

ধানমন্ডি লেক উন্নয়নের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও নতুন সাংস্কৃতিক ভেন্যু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান।

তার মতে, প্রস্তাবিত স্থানটি রবীন্দ্র সরোবরের কাছাকাছি হওয়ায় নতুন একটি সাংস্কৃতিক ভেন্যু নির্মাণের আগে এর প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা উচিত। রবীন্দ্র সরোবরে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং এসব আয়োজনে শব্দদূষণের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কাছাকাছি আরেকটি ভেন্যু তৈরি হলে আবাসিক এলাকায় শব্দদূষণ বাড়তে পারে।

আদিল মুহাম্মদ খান উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার না করে গাছপালা, খোলা জায়গা ও প্রকৃতিবান্ধব ল্যান্ডস্কেপিংকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় বাসিন্দা, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তা না হলে অপ্রয়োজনীয় কাজের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সব মিলিয়ে, ধানমন্ডি লেককে আধুনিকায়নের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিনোদনকেন্দ্র নতুন রূপ পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *