বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না, তবু নতুন এআই প্রযুক্তিতে চমক মেটার

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না, তবু নতুন এআই প্রযুক্তিতে চমক মেটার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের আসক্তি এবং ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মেটা। তবে এসব বিতর্কের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্মার্ট গ্লাস প্রযুক্তিতে নতুন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠানটি।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক ‘মেটা কানেক্ট ২০২৬’ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট ‘মিউজ’ (Muse), নতুন প্রজন্মের স্মার্ট গ্লাস এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তির উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

মেটার ঘোষণা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরুতে চালু হওয়া মিউজকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির এআই স্মার্ট গ্লাসের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা কণ্ঠের নির্দেশের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।

মিউজ মূলত একটি ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট, যা ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে। সাধারণ চ্যাটবটের মতো শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে এটি বিভিন্ন অ্যাপ ও ডিজিটাল সেবার সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে।

প্রযুক্তিটির মাধ্যমে অনলাইনে পণ্য খোঁজা, কেনাকাটায় সহায়তা, ভ্রমণের পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের মতো কাজ করা সম্ভব হবে। নতুন সুবিধাগুলো যুক্ত হলে ব্যবহারকারীরা স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে সামনে থাকা কোনো পণ্য বা বস্তু সম্পর্কে তথ্য জানতে এবং সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।

সম্মেলনে মেটা নতুন ধরনের এআই গ্লাস, ক্যামেরাবিহীন অডিও গ্লাস এবং উন্নত ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গ্লাসের পরিকল্পনাও প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ রে-ব্যান, ওকলি ও মেটা ব্র্যান্ডের অধীনে শতাধিক ধরনের এআই গ্লাস বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া ‘মিউজ চার্ম’ নামে পকেটে বহনযোগ্য একটি এআই ডিভাইসের ধারণাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা সরাসরি মিউজের সঙ্গে কথা বলতে এবং বিভিন্ন কাজে সহায়তা নিতে পারবেন।

প্রযুক্তিবিশ্লেষকদের আলোচনায় মেটার এসব উদ্যোগকে স্মার্টফোনের বাইরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নতুন ধরনের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনযুক্ত স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত এআই এজেন্টকে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গোপনীয়তার প্রশ্ন সামনে এসেছে।

একজন ব্যবহারকারীর ই-মেইল, কেনাকাটার তথ্য, ব্যক্তিগত পছন্দ কিংবা দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে এআই এজেন্ট যুক্ত হলে এসব তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন বিতর্কের মুখে পড়েছে মেটা। ফলে নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

অন্যদিকে আইনি বিতর্ক ও সমালোচনা সত্ত্বেও মেটার ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মেটার মোট আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৮০ কোটি মার্কিন ডলারে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ২৮ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ মেটার বিভিন্ন অ্যাপের দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর গড় সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৬০ কোটি, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি।

এদিকে মেটার নতুন এআই এজেন্ট মিউজ নিয়েও প্রযুক্তি খাতে আগ্রহ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটিগ্রুপ ধারণা করছে, মিউজ ভবিষ্যতে মেটার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

সিটিগ্রুপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মিউজ থেকে বছরে ২ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি একটি আর্থিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত আয় নয়।

মেটার নতুন প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট, প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচলিত সেবার পাশাপাশি ব্যক্তিগত এআই এজেন্ট ও পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির বাজারেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষ করে এমন প্রযুক্তি, যা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে, তার নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই ভবিষ্যতে ব্যবহারকারীদের আস্থা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নতুন এআই ও স্মার্ট গ্লাসের মাধ্যমে মেটা ডিজিটাল প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে চাইছে। তবে অতীতের বিতর্কের পর ব্যবহারকারীদের আস্থা কতটা অর্জন করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি, তা নির্ভর করবে নতুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা, তথ্যের সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *